• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ বৃহস্পতিবার | ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ১০:০৪ পূর্বাহ্ন

Photo
অর্থনীতিতে এত বীমা কোম্পানির ব্যবসা আছে কি!

আবু আহমেদ: বীমা নিয়ে আমার লেখাপড়া অত বেশি নয়। একেবারে নিম্ন ক্লাসের ছাত্রদের পড়ানোর জন্য আমি কিছু বীমার বই পড়েছি। পড়ে আমি এতটুকুই বুঝলাম, বীমা মানে ঝুঁকির বিপরীতে একটা নির্দিষ্ট অর্থ জোগানোর চুক্তি। সব পলিসি হোল্ডার তাদের প্রিমিয়াম বা চাঁদা দেয়। যে সদস্য ঝুঁকিতে পড়বে সে প্রতিজ্ঞামতো অর্থ পাবে। এতে তার ঝুঁকি কিছুটা হলেও লাঘব হয়। সে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বীমাকে বলা চলে শেয়ারিং দ্য রিস্ক টুগেদার। ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেওয়া। বীমাকৃত থাকলে পলিসি ক্রেতা ঝুঁকি নিয়ে কোনো কাজ করবে। সে কাজ ব্যবসাও হতে পারে, আবার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের জন্য কোনো কাজও হতে পারে। আবার সম্পদহানির বিষয়েও বীমা আছে। ব্যবসার মালপত্রের বীমা হতে পারে। সমুদ্রে জাহাজ ডুবে গেলে মালের মালিকরা যেমন বীমা কম্পানি থেকে প্রতিজ্ঞামতো ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, তেমনি জাহাজ কম্পানিও জাহাজ হারানোর জন্য বীমা কম্পানি থেকে অর্থ পেতে পারে। বীমা কম্পানি দুই রকমের। জীবন বীমা আর সাধারণ বীমা। সাধারণ বীমাকে সম্পদের বীমাও বলে। জীবন বীমার পলিসি ক্রেতা মরে গেলে নিজের জীবন ফিরে পায় না, তবে তার সন্তান-স্ত্রী পলিসি ক্রেতার জীবন বীমার অর্থ পায়। বীমা কম্পানি থেকে কে কত অর্থ পাবে এটারও একটা নিয়ম আছে। বইয়ে যা পড়েছি তা হলো, ক্ষতির বেশি কেউ অর্থ পাবে না। বরং ক্ষতির একটা অংশের অর্থ দেবে বীমা কম্পানি। অর্থাৎ বীমার মাধ্যমে একজন লোক যে পলিসিহোল্ডার তার আগের অবস্থা থেকে ভালো অবস্থানে যেতে পারবে না। গাড়ি ক্ষতি হলো ২০ লাখ টাকার। গাড়ির মালিক কখনো ২০ লাখ টাকা মূল্যমানের গাড়ির বিপরীতে ৩০ লাখ টাকা বীমা কম্পানি থেকে পাবে না। অনেকেই গাড়ির বীমাও করেন। কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য বীমা কম্পানি থেকে অর্থ পেয়েছেন বলে শুনিনি। এখানেই বীমা কম্পানির লাভ। যত কম দাবি আসবে ততই লাভ। এ জন্যই বীমা করার সময় গাড়ির বয়স, মডেল, ক্রয়মূল্য, ড্রাইভারের লাইসেন্স ইত্যাদি দেখা হয়। বেশি পুরনো গাড়ি হলে বীমার পলিসিও কম। নতুন গাড়ির জন্য পলিসি মূল্য বেশি।

জীবন বীমার ক্ষেত্রে পলিসি ক্রেতার বয়স, পেশা, রোগের ইতিহাস ইত্যাদি দেখা হয়। কম বয়সের স্বাস্থ্যবান লোকের জন্য পলিসি প্রিমিয়াম কম। আর বুড়ো লোকদের জন্য বীমার মূল্য অনেক বেশি। জানি না বাংলাদেশে জীবন বীমার ক্ষেত্রে লোকের শেষ বয়স কত দেখা হয়। ৭০ বছরের পরও কি কোনো বীমা কম্পানি লোকটার কাছে পলিসি বিক্রি করবে? করলেও করতে পারে, তবে পলিসির মেয়াদ হবে অতি স্বল্প সময়ের জন্য। কারণ হলো, বুড়ো লোকটার মৃত্যুর সময় তো স্বাভাবিকভাবেই ঘনিয়ে আসছে। মরে গেলে তো ক্ষতি বীমা কম্পানিরই। সে জন্যই বীমা কম্পানির নজর বেশি জোয়ান লোকদের প্রতি। এদের জন্য পলিসি প্রিমিয়ামও কম। এদের বোঝানো হয় আপনি যদি হঠাৎ মরে যান তখন আপনার ছেলে-মেয়েদের অবস্থা কী হবে। তাই সময় থাকতে একটা বীমা পলিসি কিনুন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত থাকুন (?)। মরণের বিপরীতে বীমা—এই ধারণা আমার মানতে বড় কষ্ট হয়। তবু বিশ্বব্যাপী এই বীমার চল আছে। এবং লোকে সানন্দে এই বীমার গ্রাহক হয়। বীমা বিক্রেতারা অনেক ট্রেনিংপ্রাপ্ত। বোঝানোর দক্ষতা তাদের আছে। কত কী সুবিধার কথা তারা বলতে থাকবে। বোনাস, লাভ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের হাতে সুন্দর করে লিখিত কিছু লিটারেচারও থাকে। প্রতি ১০ জন শ্রোতার মধ্যে অন্তত একজনকে গ্রাহক বানাতে পারলেই তার সাফল্য। তাই তারা সফল হওয়ার জন্য বেশ চেষ্টা করে। শুনেছি পলিসির ৭০ শতাংশই কমিশন এজেন্টকে দেওয়া হয়। তাইতো এক দল শিক্ষিত লোক বীমার এজেন্ট হয়ে ময়দান চষে বেড়াচ্ছে। আবার বীমা কম্পানিগুলোর বুদ্ধি আছে। যে গ্রাহক যার কথা শুনবে, তাকে সেই গ্রাহকের কাছে পাঠানো হচ্ছে।

কোনো কোনো বীমার এজেন্টকে দেখা যাবে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় সালাম দিয়ে দোকানিকে বলছে একটা পলিসি কিনুন, লাভ হবে। দোকানিও দেখে এই লোকটার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়, নামাজেও দেখা হয়। বীমার এই লোকটা যা বলছে তা করলে তার উপকার হবে। বীমা ব্যবসা সম্পর্কে আমি যা পড়েছি তার থেকে বুঝলাম, বীমা হলো পরিসংখ্যান ব্যবহারের বিজ্ঞান। পরিসংখ্যান বিজ্ঞানের দুটি শর্তের বিষয় আমি অর্থনীতি পড়ার প্রয়োজনে পড়েছি। অতি দরকারি বিদ্যা। অধ্যয়নের প্রতিটি শাখায়ই এর ব্যবহার। তবে পরিসংখ্যান হলো, মূলত প্রবাবিলিটি সায়েন্স

প্রবাবিলিটি আমাদের শিক্ষা দেয় একটা ঘটনা ঘটবে কি ঘটবে না। বীমার ক্ষেত্রেও তাই দুর্ঘটনাটা ঘটবে কি ঘটবে না, জীবনটা চলে যাবে কি যাবে না, আমার কাছে মনে হয় বীমা ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রবাবিলিটি বিজ্ঞানকে বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করা হয়। আমি বাহককে জানালাম, বীমা কম্পানিতে কমপক্ষে একজন অ্যাকচুয়ারি থাকেন। তিনি পলিসি মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন। আগে আমাদের দেশে অ্যাকচুয়ারি বিজ্ঞানটা পড়ানো হতো না। বিলেতে পড়ানো হতো। কেউ অ্যাকচুয়ারি বিষয়ে একটা ডিপ্লোমা করে দেশে এলে তাঁর অনেক মূল্য হতো। এই হলো বীমা ব্যবসা বা বীমা নিয়ে আমার জ্ঞান। তবে বীমা কম্পানির স্থিতিপত্র বা ব্যালান্সশিট আমি ততটা বুঝি না। এদের স্থিতিপত্রে শেয়ারপ্রতি আয় EPS পাওয়া যায় না। এ জন্যই বোধ হয় অনেক লোকের বীমা কম্পানির শেয়ার কিনতে এত অনীহা। বাংলাদেশে বীমা কম্পানিগুলো বড়ই বিপদে আছে। অর্থনীতি ছোট কিন্তু কম্পানি বেশি। প্রথম দিকে কয়েক লাখ টাকার মূলধন জোগান দিয়ে একটা বীমা কম্পানি প্রতিষ্ঠা করা যেত। যারা প্রথম জেনারেশনের বীমা কম্পানি স্থাপন করেছে ব্যক্তির পকেট থেকে মাত্র ১০ লাখ টাকা দিয়ে, আজকে সে শুধু বীমা কম্পানির শেয়ার বেচে কয়েক শ কোটির মালিক না হলেও শত গুণের মালিক তো অবশ্যই। তদুপরি চেয়ারম্যান, ডিরেক্টর ইত্যাদি পদবি তো আছে। বীমার জগতে আস্থার সংকট প্রকট। এ জন্য বীমা কম্পানির মালিকরাই অনেকাংশে দায়ী। শুনেছি বীমা ব্যবসায় পুনঃ বীমা করা আবশ্যকীয়। এও শুনেছি পুনঃ বীমা থেকে অর্থ পেয়ে অনেক বীমা কম্পানি আজও বেঁচে আছে। আস্থার সংকটে পড়ে অনেক বীমা কম্পানির মালিক তাদের পুঁজি ক্ষয় করে ব্যবসার সাইনবোর্ডটা আজও টিকিয়ে রেখেছে। বীমাকে লোকে প্রয়োজনীয় কিছু মনে করতে হবে আর যারা বীমার প্রডাক্টস বিক্রি করছে তাদেরও লোকে বিশ্বাস করতে হবে। এও শুনেছি কয়েকটা কিস্তি দিয়ে কোনো লোক যদি আর কিস্তি দিতে না পারে তাহলে তার পলিসি তামাদি হয়ে যায়। কিস্তিদানকারী বীমা কম্পানি থেকে কিছুই পাবে না।

আমাদের এই সাইজের অর্থনীতিতে যতগুলো বীমা কম্পানি থাকার কথা তার থেকে এদের সংখ্যা ঢের বেশি। সব দিকেই বীমার সাইনবোর্ড। এক রুমের অফিস, সঙ্গেই সাইনবোর্ড। প্রচারের জন্য এর প্রয়োজন হচ্ছে। উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে চলে গেছে বীমা কম্পানি। বন্ধুবান্ধব লোকজন এজেন্ট হিসেবে কাজে লেগে গেছে। একজনকে গ্রাহক করতে পারলেই যে অনেক লাভ! সরকারও বীমা কম্পানির অনুমোদন দিতে বেশ উদারতা দেখিয়েছে। কাউকে নিরাশ করেনি। যে চেয়েছে তাকেই অনুমতি দিয়েছে। সরকারের অবস্থান অনেকটা এই রকম, তোমরা কিছু করে খেতে চাচ্ছ, তাই তোমাদেরও বীমা কম্পানির অনুমোদন দিলাম। ব্যাংক ও বীমা কম্পানির ব্যবসা ভালো হবে যদি মানুষ ওই সব কম্পানিকে বিশ্বাস করে। মানুষের বিশ্বাস অর্জনই হলো এই দুই ব্যবসার ক্ষেত্রে আসল পুঁজি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই দুই আর্থিক খাতেই জনগণের বিশ্বাসের ধস নেমেছে। বীমা কম্পানির ভাগ্য ভালো যে তাদের গ্রাহকরা সরাসরি তাদের কাছে আসে না। এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে বেশির ভাগ কার্যসম্পাদন হয়। কিন্তু চারদিকে তাকালে মানুষ যখন দেখে এত বীমা কম্পানির সাইনবোর্ড, তখন মানুষ এদের ব্যবসাকে সন্দেহের চোখে দেখে। শুনেছি এজেন্টকে নাকি বীমা কম্পানি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেয়। এমনও শুনেছি যে এজেন্ট পলিসির অর্থ বীমা কম্পানিতে জমা না দিয়ে নিজেই বেহাত করে বসে! এ অবস্থায় যখন বলা হয় বীমা বাজারের আরো প্রসার ঘটুক তখন প্রশ্ন জাগে—কেন? এই ব্যাপ্তি ও প্রসারতার আদৌ প্রয়োজন আছে কি?

লেখক : আবু আহমেদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



ব্লগটির ক্যাটাগরিঃ পাঠক কলাম

-- ব্লগার M. Mahbubur Rahman এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
1 1 0 5 2
আজকের প্রিয় পাঠক
1 0 5 6 9 8 7 9
মোট পাঠক