• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ মঙ্গলবার | ২১ জানুয়ারী, ২০২০ | ৮ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন

Photo
বীমা সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও করণীয়

ছোটবেলা থেকেই আমাদের দেশে দেখে আসছি আমাদের আশেপাশের মানুষগুলো কোন বিপদে পড়লে বিশেষ করে অসুখে বা দুর্ঘটনায় পড়লে আমরা সাহায্যের আবেদন জানাই। বন্ধুবান্ধব প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ অপরিচিত জনকেও আমরা মানবিক সামাজিক এবং নৈতিক দায়বোধ থেকে যে যতটুকু পারি ততটুকু সাহায্য করি বা করার চেষ্টা করি। তারা খুবই ভাগ্যবান যারা সময়মত সঠিক সাহায্য টুকু পান। কিন্তু যারা পায় না তাদের মত দুর্ভাগা আর হয় না।

সমস্যাটা হয় মূলত চারটি ক্ষেত্রে।  
প্রথমতঃ যদি সাহায্যের অংকটা অনেক বড় হয়।  
দ্বিতীয়তঃ সাহায্যপ্রার্থীর সংকোচ অথবা অন্য কোন কারণে সাহায্যের আবেদন যথাযথ প্রচার না পাওয়া।  
তৃতীয়তঃ প্রচার পেলেও সেই আবেদন সবার কাছে হয়তো তেমন ভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। আর চতুর্থ সমস্যাটা একটু রূঢ় এবং বিরল হলেও অবাস্তব নয় আর তা হল সাহায্যকারী সাহায্য দিতে দিতে ক্লান্ত বা সাহায্যকারীর এর চেয়ে বেশি সাহায্য করার আর সামর্থ্য নেই।
মানুষের খারাপ সময়ের কথা চিন্তা করেই সেই সময়ে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য সমবায় সমিতি, বীমা ইত্যাদি ধারণার সূচনা, যেখানে একদল মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখবে এবং সেই দলেরই কেউ কোন ধরনের সমস্যায় পড়লে তাকে সেই সংগৃহীত অর্থ হতে সহায়তা করা হবে।

সময়ের পরিক্রমায় এই বীমা ধারণার পরিসর, কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা এমন ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে উন্নত বিশ্বে অনেক দেশেই এটা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক। আর যে সকল দেশে বাধ্যতামূলক না সেখানকার মানুষজন তাদের প্রয়োজনের তাগিদে নিজ থেকেই বিভিন্ন ধরনের বীমা করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষগুলোর কাছে বীমা ধারণাটা অত জনপ্রিয় না। অথচ আমাদের দেশের মানুষগুলোর জন্য এর প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ আমাদের বেশিরভাগ মানুষেরই চাকরি বা ব্যবসা যাই করুক না কেন সঞ্চয় তুলনামূলকভাবে খুবই কম, আর অন্যান্য খরচ বা চিকিৎসা খরচ অনেক বেশি। তাই অনেক ভালো চাকরি বা ব্যবসা করেও দেখা যায় কোন খারাপ অসুখ হলে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে সেই অর্থের যোগান দেয়া সম্ভব হয় না আর তখনই প্রয়োজন সাহায্যের। ধরা যাক একটি পরিবারের একজনই কর্মক্ষম ব্যক্তি এবং তার রোজগারেই সংসার চলে। কোন কারণে সেই ব্যক্তি যদি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয় তখনই নানা সমস্যা শুরু হয়। হয়তো তার প্রয়োজন পড়ে লক্ষাধিক টাকার সেই সাথে দুর্ঘটনার কারণে চাকরি হারাতে হতে পারে আর তখনই প্রয়োজন সম্মিলিত সাহায্যের। যে মানুষগুলো সাহায্য করে যাচ্ছেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অংকের টাকা প্রদানের মাধ্যমে অথবা জোগাড় করার মাধ্যমে তারা যদি একটু সংগঠিতভাবে এবং কিছু নিয়ম অনুযায়ী এই কাজটা করে যান তাহলে কিন্তু একটি সাহায্যকারী সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই সাহায্যকারী সংগঠনটির আরেক নাম বীমা প্রতিষ্ঠান।  

আমরা যখন কাউকে সাহায্য করি তখন তা ধার হিসেবে দেই না বা লাভের উদ্দেশ্যেও দেই না। বীমা প্রতিষ্ঠানেও একটি নির্দিষ্ট পরিমান টাকা প্রতি মাসে আমাদের দিতে হয় যা সাহায্যের পরিমাণ এর তুলনায় অনেক কম কিন্তু পার্থক্যটা এই যে এখানে আপনি নিজেও কখনো সাহায্য প্রার্থী হলে পলিসি অনুযায়ী আপনিও সাহায্য পাবেন। আর প্রতি মাসে জমা দেবার টাকাটা আপনার বন্ধুকে বা আত্মীয়কে সাহায্যের এককালীন দেয়া টাকার তুলনায় অনেক কম।

খুবই সাধারণ, ছোট একটি উদাহরণ দেয়া যাক।  
ধরা যাক, এক কোটি মানুষ আমাদের দেশে আজ দুর্ঘটনা বীমা করল। নিয়ম হচ্ছে, প্রতি মাসে সবাই ১০ টাকা করে ১০ বছর পর্যন্ত জমা রাখবেন। তাহলে মাস শেষে সংগ্রহ দাঁড়াবে ১০ কোটি টাকা, বছর শেষে ১২০ কোটি টাকা আর দশ বছরে বারোশো কোটি টাকা। এর মাঝে জনপ্রতি ১০ বছরে জমা করলো মাত্র বারোশো টাকা। এখন নিয়ম হল এই এক কোটি মানুষের মধ্যে কেউ যদি দুর্ঘটনার শিকার হন তবে তার পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই পরিমাণ অর্থ পাবে। যেমন কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেলে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পাবে অথবা কোন অঙ্গহানি ঘটলে ৫০ লক্ষ টাকা কিংবা চিকিৎসা বাবদ সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা। তাহলে জমাকৃত টাকায় সর্বোচ্চ ১২০০ জন দুর্ঘটনায় মারা গেলে সেই ১২০০ জনের পরিবার এক কোটি টাকা করে পাবে, অঙ্গহানি হলে ২৪০০ জন ৫০ লক্ষ, আর চিকিৎসা বাবদ সর্বোচ্চ ৪৮০০ জন ২৫ লক্ষ টাকা করে পাবেন। উদাহরণটি সহজভাবে বোঝানোর জন্য বারোশো কোটি টাকা টা স্থির ধরা হয়েছে। কিন্তু এই টাকাটা থেকে কিছু অংশ যদি লাভজনক বিনিয়োগ করা হয় তবে তার পরিমাণ বারোশো কোটি টাকা ছাড়িয়ে অনেক বেশি হয়ে যাবে। আর তাই বাস্তবে অনেক গুণ বেশি পরিমাণে টাকা অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণে বীমা প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে চালু রয়েছে এবং এর ভোক্তাদের সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।

কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষজনের কাছে কিছু কারণে ইন্সুরেন্স সম্পর্কে আগ্রহ নেই বললেই চলে। এই অনাগ্রহের প্রথম কারণ হলো ইন্সুরেন্স সম্পর্কে প্রচার এবং প্রচারণা খুব কম আর থাকলেও তা সাধারন জনগনের পর্যায়ের না। খুব ছোটবেলায় জীবন বীমা কর্পোরেশনের একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে দেখা যেতো দুজন বয়স্ক দম্পতি নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং পরে বলা হচ্ছে “এই ভাবনাহীন জীবন, জীবন বীমার পেনশন পলিসিরই অবদান“। এই বিজ্ঞাপনটি সকল শ্রেণীর এবং পেশার মানুষদের বোধগম্য না বলেই আমার মনে হতো। আবার সেই সময় কতজন মানুষের ঘরে টেলিভিশন ছিল তা হাতে গুনে বলা যেত।

ঠিক একই সময়ের আরো একটি বিজ্ঞাপন ছিল যা অতি উচ্চ মানের। প্রতিষ্ঠানের নামটি আমার মনে নেই। সেখানে একটি ক্যাঙ্গারু ছানা জঙ্গলের মাঝে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর তখনই সেখানে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে, তখন ছানাটি দৌড়ে মায়ের পেটের থলের ভিতর ঢুকে যায়। অনেক পরে বুঝতে পারলাম মা ক্যাঙ্গারুটি হল আপনার বীমা পলিসি আর আপনি বিপদে পড়লে এমনি করে মা ক্যাঙ্গারুর মত পলিসিটি আপনাকে সহায়তা করবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে আমাদের দেশে ইন্স্যুরেন্সের প্রচারণা কতটা দুর্বল।

দ্বিতীয়তঃ আমি আমার আশেপাশের কিছু আত্মীয় পরিজন কে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি যে ইন্সুরেন্স নিয়ে আমাদের মাঝে কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে যেমন,
১) ইন্সুরেন্স মানেই ভাঁওতাবাজি। পলিসি একটি বিক্রি করেই আর তাদের কোন খবর থাকবে না
২) প্রিমিয়াম টাকা একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে লাভ সহ ফেরত পাওয়া
৩) বীমার টাকা কখনোই পুরোটা পাওয়া যায় না
৪) ইন্সুরেন্স সম্পর্কে ধর্মীয় বিধি নিষেধ
এই ধারণা গুলো আমাদের দেশের কতিপয় অসাধু বীমা ব্যবসায়ী এবং বিক্রয় প্রতিনিধির কারণে তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারের কাজ হচ্ছে সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালোভাবে পর্যালোচনা করে অনুমতি দেয়া এবং এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নজরদারি করা। একই সাথে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও সরকারকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়তঃ বীমা প্রতিষ্ঠান গুলো নৈতিকভাবে কাজ করা। যে কোন প্রতিষ্ঠানেরই উচিত নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া তা সে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই হোক আর অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় বা সাময়িক একটু লাভের জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেয়া থেকে বিরত থাকাই নৈতিক সংগঠন হবার প্রধান শর্ত। সেই সাথে বিক্রয় প্রতিনিধিরাও যেন ভোক্তাকে প্রতারিত না করে তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

তৃতীয়তঃ সাধারন জনগন কে আরো সচেতন হতে হবে। যাচাই করে ভালোভাবে বুঝে তবেই প্রতিষ্ঠান বাছাই এবং পলিসি গ্রহণ করতে হবে। ধর্মীয় বিধি-নিষেধ সম্পর্কে এখানে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না তবে বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই বিভিন্ন পদ্ধতিতে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি গুলো পরিচালিত হচ্ছে।
সর্বশেষে একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে শেষ করবো। ইদানিং আমাদের দেশে ব্যাচ ভিত্তিক যেমন এসএসসি-এইচএসসি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ভিত্তিক ভার্চুয়াল এবং রিয়াল সংগঠন চালু হচ্ছে। এদের অনেকগুলোই আবার পরবর্তীতে বাণিজ্যিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাচগত কারণে আমিও 96-98 এর ফেসবুক গ্রুপের একজন সদস্য। ক্লাব 96-98 লিমিটেড কোম্পানি এই ব্যাচের সদস্যদের নিয়ে তৈরি একটি প্রতিষ্ঠান। ঠিক একইভাবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে তৈরি আরেকটি সংগঠনের নাম “সাস্ট ক্লাব লিমিটেড”। এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয়তা, অংশগ্রহণ এবং নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি বলে আমার মনে হয়, কারণ আমরা বা আমাদেরই পরিচিতজনদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখানে রয়েছে। এই সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে সাহায্য জোগাড় করে থাকে। সুতরাং এরা যদি সংঘবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে ইন্সুরেন্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে আসতো তবে সকলের জন্যই অনেক সুবিধা হতো বলে আমার বিশ্বাস।

রাশেদ খান লেখক, গবেষক, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন


-- ব্লগার সাথী আক্তার এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
9 8 0 1
আজকের প্রিয় পাঠক
1 7 4 9 3 0 6 6
মোট পাঠক