• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ বুধবার | ২৭ মে, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ন

Photo
চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করার আগে যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন

আশরাফ সাহেব ১০ বছর ধরে টেক্সটাইল মেশিনারিজ আমদানীকারক একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে ভালো পদে কাজ করছেন। বিদেশী বিক্রেতা ও দেশী ক্রেতাদের সাথে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ আছে। এবং সেই কারনে সবার সাথেই একটি ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। এখন তাঁর মনে হচ্ছে তিনি চাইলে নিজেই এমন একটি ব্যবসা খুলে বসতে পারেন।

সেইজন্য তাঁর যথেষ্ঠ যোগাযোগ ও মূলধন রয়েছে। কিন্তু তারপরও তিনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। কারণ, কিছু ব্যাপারে এখনও তিনি নিশ্চিত নন। প্রথমবারের মত চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় পুরো সময় দেয়াটা অনেকটা পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার মত। বেঁচে গেলে দারুন একটি অভিজ্ঞতা। সবাই আপনাকে বাহবা দেবে, নিজেও বিরাট কিছু অর্জন করবেন। কিন্তু একটু এদিক সেদিক হলেই আর দেখতে হবে না!

অন্য যে কোনও কাজে নামার চেয়ে এই কাজে আপনাকে অনেক বেশি বিবেচনা করতে হবে। ঝাঁপ দেয়ার আগে লাইফ জ্যাকেট ঠিক আছে কিনা দেখে নিতে হবে। আপনি যতই নিজের পথে যেতে চান না কেন, এটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, আপনার আগের সম্পর্ক ও কানেকশন গুলো যেন কোনওভাবেই নষ্ট না হয়। সেই সাথে এটাও লক্ষ্য রাখতে হবে যে আপনি সঠিক সময়ে এই সিদ্ধান্তটি নিচ্ছেন। অন্যথায় “আম, ছালা – সবই যাবে”।

আপনাকে এমন একটি পয়েন্টে এসে কাজটি করতে হবে, যখন আপনি দুই জগতেরই সবচেয়ে ভাল দিকগুলো উপভোগ করছেন। অর্থা‌ৎ আপনার চাকরিও ভালো চলছে, সেই সাথে ব্যবসার অবস্থাও ভালোর দিকে।

একটি নতুন উদ্যোগের ফলাফল কেমন হবে তার অনেকটাই সেই ব্যবসায় পুরোপুরি নিয়োজিত হওয়ার আগেই বোঝা যায়। যদি অবস্থা ভালো মনে হয়, তবে আপনি আপনার চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে স্বাধীন ব্যবসার চ্যালেঞ্জে ঝাঁপিয়ে পড়তেই পারেন। কিন্তু কিভাবে বুঝবেন যে এখন চাকরী ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ব্যবসায় নামার সময় হয়েছে? – এক্ষেত্রে নিচের ১১টি বিষয় নিশ্চিত হয়ে তবেই চাকরী ছাড়ুন:

০১. একটি সত্যিকার ভালো পন্য বা সার্ভিস আপনার হাতে আছে
শুধুমাত্র একটি আইডিয়া, কিছু স্যাম্পল বা প্রটোটাইপ, সার্ভিস ডেমো – বা এই ধরনের জিনিসপত্র হাতে থাকাটা ব্যবসায় পুরোপুরি নামার জন্য যথেষ্ঠ নয়। আপনার হাতে এমন কিছু থাকতে হবে যা সত্যিকার লাভজনক ব্যবসার সৃষ্টি করবে। আপনার কাছে যা-ই থাক না কেন, তার পেছনে একটি ভালো পরিকল্পনা ও প্রমাণিত বিজনেস মডেল থাকতে হবে। এবং এটা কতটা লাভজনক হতে পারে তার বাস্তব সম্মত তথ্য আপনার হাতে থাকতে হবে।

শুধুমাত্র একটি আইডিয়া বা হঠা‌ৎ আসা সুযোগের ওপর ভিত্তি করে এতবড় ঝুঁকি নেয়া আজকের দিনে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আপনাকে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে হবে আপনার হাতে যে পন্য বা সেবা আছে, তা বাজারে সত্যিই চলছে; এবং তা থেকে আপনার লাভ আসার পাশাপাশি আবার বিনিয়োগ করার মত যথেষ্ঠ অর্থ আসছে। এই ব্যাপারে যতক্ষণ না নিশ্চিত হতে পারছেন – ততক্ষণ এতবড় ঝুঁকির পথে পা বাড়াবেন না।

০২. আপনার সত্যিকার ক্রেতা সৃস্টি হয়েছে
আপনার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব কখনওই আপনার সত্যিকার ক্রেতা বা গ্রাহক নয়। আপনি যদি একটি অনলাইন ফ্যাশন স্টোর খোলেন, এবং তার গ্রাহক যদি হয় শুধুমাত্র আপনার পরিচিত মানুষ আর আপনার ব্যক্তিগত ফেসবুক বন্ধুরা – তবে বলতেই হচ্ছে, আপনি এখনও কোনও ‘সত্যিকার’ ক্রেতা পাননি। আর এই অবস্থায় সবকিছু বাদ দিয়ে সেই ব্যবসার পেছনে লাগাটা মোটেও ভালো কিছু নয়।

আপনার টার্গেট কাস্টোমার, সাধারন ভোক্তা, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা – যে-ই হোক না কেন, আপনার পরিচিত গন্ডির বাইরের মানুষ যতক্ষণ আপনার পন্য বা সার্ভিস না নিচ্ছে – ততক্ষণ বলা যাবে না যে আপনার সত্যিকার ক্রেতা আছে। শুধু সম্পর্কের খাতিরে মানুষ খুব বেশিদিন কারও কাছ থেকে পন্য বা সেবা নেয় না – যদি না সেটা আসলেই ভালো কিছু হয়। আর আপনি আসলেই ভালো পন্য বা সেবা সৃষ্টি করছেন কিনা, তা নিশ্চিত হবেন তখনই, যখন সাধারন ক্রেতারা আপনার থেকে পন্য বা সেবা নেয়া শুরু করবে।

০৩. দীর্ঘ সময় ব্যবসা চালিয়ে নেয়ার মত মূলধন আপনার কাছে জমা আছে
এক্সপেরিমেন্ট করে আপনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন আপনার ব্যবসা ভবিষ্যতে ভালোই চলবে, এবং আপনার সত্যিকার ক্রেতার সংখ্যাও একটু একটু করে বাড়ছে। কিন্তু একটি ব্যবসা সত্যিকারের ‘রানিং’ হতে ও নিয়মিত লাভ উঠে আসতে ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

এর মানে হচ্ছে, আপনার ব্যবসা হয়তো ভালো চলছে, কিন্তু যতটা প্রয়োজন, ততটা অর্থ এখনও ব্যবসা থেকে আসছে না – যা দিয়ে আপনি ‘মাছের তেলে মাছ ভাজার’ মত করে ব্যবসার লাভ থেকেই ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারছেন।

এই পর্যায়ে আসার আগে ব্যবসার মালিকের ব্যবসার টাকা থেকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো ব্যবসার জন্য খারাপ। কাজেই যতদিন না ব্যবসার টাকা থেকে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারছেন, এবং দীর্ঘ সময় ব্যবসা চালিয়ে নেয়ার মত মূলধন আপনার একাউন্টে জমা হচ্ছে – ততদিন পুরোপুরি ঝুঁকি না নেয়াই ভালো।

০৪. চাকরির চেয়ে ব্যবসাটি বেশি উপভোগ করছেন
সব উদ্যোক্তাই যে তাদের চাকরিকে অপছন্দ করেন তা কিন্তু নয়। ভূমিকায় বলা আশরাফ সাহেবের কথাই ধরা যাক। টেক্সটাইল মেশিনারিজ মার্কেটিং করাটা শুধু তাঁর চাকরী নয়, এটা তাঁর প্যাশন। সেইজন্যেই তিনি এটাকেই ব্যবসা হিসেবে বেছে নিতে চাচ্ছেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি যে কাজ করবেন, ব্যবসাতেও প্রায় সেই একই কাজ করবেন। এবং কাজটিকে তিনি যথেষ্ঠ উপভোগ করেন।

চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করার আগে ভাবুন
একারণে, যাঁরা চাকরিতে নিজের কাজ পছন্দ করেন না, তাঁদের চেয়ে যাঁরা চাকরিতেও নিজের কাজ উপভোগ করেন – তাঁদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এবং ব্যবসায়ের প্রথম অবস্থায় হয়তো কাজগুলো চাকরির প্রতিষ্ঠানের মত এতটা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য হয় না। কাজেই চাকরির কাজকেই বেশি উপভোগ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু ব্যবসার চ্যালেঞ্জটি চাকরিতে নেই। এবং একজন সত্যিকার উদ্যোক্তা এই চ্যালেঞ্জটি উপভোগ করেন। তাঁর কাছে এটি অশান্তির বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না।

তবে এই পর্যায়ে পৌঁছতে কিছু কিছু উদ্যোক্তার কিছুটা সময় লেগে যায়। অনেক সময়েই জেদের বশে এবং লক্ষ্য পূরণের তাগিদে অনেকে ব্যবসার কাজ করে যেতে থাকেন – সেই সাথে তাঁরা নিজেদের চাকরিও উপভোগ করেন। এতে দোষের কিছু নেই, একটা সময়ে গিয়ে প্রায় সব উদ্যোক্তাই ব্যবসার চ্যালেঞ্জকে উপভোগ করতে শুরু করেন। অথবা ব্যবসা একটি ভালো পর্যায়ে চলে এলেও এটা ঘটে।

আপনার ক্ষেত্রে যেটাই হোক না কেন, আপনি নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি ব্যবসা করাকে পুরোপুরি উপভোগ করছেন। এবং তারপরই চাকরি ছাড়ুন। অন্যথায় কাজ উপভোগ করতে না পারলে আপনার মনে আফসোস হবে, এবং এতে ব্যবসায় আপনি পূর্ণ মনযোগ দিতে পারবেন না। দিন শেষে যা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর।

মনে রাখবেন, ব্যবসার মালিকের মনোভাব তার সহযোগীদের ওপর দারুন প্রভাব ফেলে। আপনি যদি আপনার কাজ উপভোগ না করেন, তবে অন্যদেরও সেই অবস্থা হবে।

০৫. নিশ্চিত হোন যে আপনার পেছনে কোনও বড় প্রতিযোগী লাগেনি
আপনি যদি চাকরিজীবি অবস্থা থেকে ব্যবসায়ে নামার পরিকল্পনা করেন, তবে ধরে নেয়া যায় বর্তমানে আর্থিক দিক দিয়ে আপনার তেমন একটা শক্ত অবস্থান নেই (যদি না আপনার পেছনে এক বা একাধিক বাঘা ইনভেস্টর থাকে)। এই ক্ষেত্রে আপনাকে একটু সাবধানে পা ফেলতে হবে, বিশেষ করে আপনি যদি দারুন প্রতিযোগীতাপূর্ণ কোনও ব্যবসায় নামতে যান।

আপনি যদি একদম ছোট থেকে শুরু করেন, আপনার পন্য বা সেবা প্রস্তুত করতে যে পরিমান খরচ হয়, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তারচেয়ে অনেক কম খরচে তা প্রস্তুত করতে পারে।

প্রাচীন যুগে দাসমালিকরা দাসদের খাটিয়ে অনেক কম খরচে তাদের পন্য তৈরী করত। অন্যদিকে সাধারন কৃষক ও কারিগরদের সেই একই পন্য প্রস্তুত করতে অনেকটা বেশি খরচ পড়ত। এর ফলে, ধনী দাসমালিকরা কৃষক ও কারিগরদের চেয়ে কম মূল্যে বাজারে পন্য ছাড়তে পারত, যার ফলে কৃষক ও কারিগর শ্রেনী তাদের পন্যের বাজার পেত না।

প্রাচীন গ্রীসে বহু কৃষক ও কারিগর তাদের কারবার গুটিয়ে সেনাবাহিনী বা অন্য চাকরি করতে বাধ্য হত। বর্তমানে দাস প্রথা না থাকলেও, এই একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের একচেটিয়া ব্যবসা টিঁকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুনদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দেয় না।

অনেক সময়ে নতুন প্রতিযোগীদের বাজার থেকে তাড়াতে বড় কর্পোরেশন গুলো রীতিমত লস দিয়ে তাদের পন্য বিক্রী করে। তাদের অন্যান্য অনেক পন্য বাজারে থাকার কারণে এই লস তারা পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগের এই সুবিধা না থাকার কারণে তারা প্রতিযোগীতায় টিঁকতে পারে না।

ব্যবসায় পূর্ণ ভাবে নামার আগে তাই নিশ্চিত হয়ে নিন, আপনার সাথেও এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। তাহলে ব্যবসার ধরন বা পরিকল্পনায় বদল আনুন। নিরবে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে মার্কেট ছোট করে আনুন। কারণ, নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে বড় কর্পোরেশনের রোষানলে পড়াটা বেশ বিপজ্জনক। এই ঝুঁকিকে একদম কম করে তারপরই ব্যবসায় পুরো সময় দিন।

০৬. নিশ্চিত হয়ে নিন ব্যবসাটি ৩ থেকে ৫ বছর টিঁকে থাকবে
দু:খ জনক হলেও সত্যি যে নতুন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগুলোর অর্ধেকই শুরুর ৫ বছর পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তিন ভাগের এক ভাগ কোম্পানী ৩ বছরের মধ্যে তাদের মূলধন খুইয়ে বসে। আরও একভাগ ক্ষতির মুখে না পড়লেও লাভও করতে পারে না – অর্থা‌ৎ তাদের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয় না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও একটা সময়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোনও ব্যবসা ৩ বছরের ভেতর নিয়মিত লাভ করলে এবং ৫ বছরের বেশি টিঁকে গেলে, তার বড় কোম্পানী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটা ঠিক যে ব্যবসায় পূর্ণ মনযোগ ও সময় দেয়ার জন্য আপনি ৩ থেকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে চাইবেন না। এবং এটা যুক্তিযুক্তও নয়। তবে?

আপনাকে যা করতে হবে তা হল, একটি ভালো রিসার্চ। দীর্ঘ মেয়াদে আপনার মার্কেটের অবস্থা কি হতে পারে, বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় ৩ বা ৫ বছর পর আপনার ব্যবসার অবস্থান কি হবে – এই সম্পর্কে একটি ভালো ধারনা আপনাকে এখনই করে নিতে হবে। এজন্য আপনি অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারেন, ফাইনানশিয়াল ও বিজনেস কনসালটেন্টদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন – সেইসাথে নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারেন।

ব্যবসা কখনওই নিশ্চিত কিছু নয়। এতে ঝুঁকি থাকবেই। হাজার রিসার্চ করার পরও আপনি ১০০ ভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবেন না যে আপনার ব্যবসার ভবিষ্য‌ৎ কি হতে যাচ্ছে। তারপরও এটা আপনাকে ভবিষ্যতের একটি ইঙ্গিত দেবে, যার ফলে আপনি যে কোনও পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবেন। নিশ্চিত হতে না পারলেও পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি থাকাটা নি:সন্দেহে ব্যবসার জন্য ভালো।

০৭. নিশ্চিত হয়ে নিন আপনি সত্যিই “নিজেই নিজের বস” হতে পেরেছেন
নিজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারাটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আপনার ওপরে যখন একজন বস থাকবেন, এবং আপনি জানবেন যে আপনার ওপর সব সময়ে নজরদারী করা হচ্ছে, তখন আপনি এমনিতেই আপনার নির্ধারিত কাজ মনযোগ দিয়ে করবেন।

কিন্তু যখন আপনি নিজেই আপনার নিজের বস, এবং আপনার ওপর নজর রাখার কেউ নেই – তখন পূর্ণ মনযোগে কাজ করাটা বেশ কঠিন। কারণ আপনি চাইলেই কাজ থেকে ছুটি নিতে পারছেন; পরিশ্রমের মাঝে চাইলেই একটু আরাম করতে পারছেন। কিন্তু একটি ব্যবসাকে দাঁড় করাতে গেলে একাগ্র মনে গভীর ভাবে কাজ করাটা খুবই জরুরী। আর এজন্য আপনাকে নিজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। নিজেকে শাসন করা শিখতে হবে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারলে অন্যদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

এই শৃঙ্খলা যতক্ষণ আপনার মাঝে না আনতে পারছেন, ততক্ষণ চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামাটা ঠিক হবে না। তাহলে দুই দিকই হারানোর একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে আপনি চাকরি করা অবস্থায় এই অভ্যাসটি নিজের মাঝে করে নিতে পারেন। যেমন ধরুন অফিস থেকে ফিরে আপনি স্বাভাবিক ভাবেই ক্লান্ত থাকবেন। মন চাইবে একটু আরাম আর বিনোদন। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত হয়তো আপনি টিভির সামনে কাটিয়ে দেন।

নিজের মাঝে শৃঙ্খলা আনতে এই অভ্যাসটি পরিবর্তনের চেষ্টা করুন।
সবকিছু সময় বেঁধে করার চেষ্টা করুন। এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ না করতে পারলেও, প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ে শুরু করার চেষ্টা করুন। যেমন আপনি অফিস থেকে ফিরে ৩০ মিনিট হয়তো রেস্ট নিলেন। তারপর টিভি বা সিনেমা দেখে সময় নষ্ট না করে নিজের কাজ নিয়ে একটু পড়াশুনা করতে পারেন, টিউটোরিয়াল দেখতে পারেন।

প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস করুন। – এই অভ্যাসগুলো আপনাকে শৃঙ্খলার মাঝে নিয়ে আসবে। পরবর্তীতে সব কাজই আপনি নির্ধারিত সময় ধরে পূর্ণ মনযোগে করতে পারবেন, যা আপনার উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়ার জন্য অপরিহার্য। আর পুরোপুরি ব্যবসায়ে নামার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি কোনও প্রকার নজরদারী ছাড়াই নিজের মত করেই কাজ করতে পারেন। নিজের সত্যিকার বস হয়ে তারপর অন্য বসকে বিদায় জানান।

০৮. আপনি আপনার কাজের ক্ষেত্রে একজন মাস্টারে পরিনত হয়েছেন
আরেকবার আশরাফ সাহেবের দিকে তাকানো যাক। টেক্সটাইল মেশিনারিজ মার্কেটিং এ তাঁর অনেক বছরের ক্যারিয়ার, এবং তিনি এই ক্ষেত্রেই ব্যবসা করতে চাচ্ছেন। কারণ, তাঁর এই ফিল্ডে যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা আছে। তিনি নি:সন্দেহে একটি ভালো কাজ করছেন, এবং বলাই যায় তাঁর সফল হওয়ার একটি ভালো সম্ভাবনা আছে।

এই আশরাফ সাহেবই যদি টেক্সটাইল মেশিনারিজ বাদ দিয়ে আইসক্রিম এর ব্যবসায় নামতে চাইতেন, তবে কি তাঁর সফল হওয়ার সম্ভাবনা এতটা বিশ্বাসের সাথে বলা যেত?

বাস্তবতা বলে, যেত না। কারন এই ফিল্ডে তাঁর তেমন কোনও অভিজ্ঞতা নেই। তিনি হয়তো নিজে আইসক্রিম খেতে পছন্দ করেন বলে এই ক্ষেত্রে নামতে চাইছেন। কিন্তু শুধুমাত্র পছন্দের খাতিরে কোনও ব্যবসায় নামাটা পাকা ব্যবসায়ীর লক্ষণ নয়। হ্যাঁ – পছন্দের ব্যবসায়ে আপনি নামতে পারেন, তবে আপনাকে সেই ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ দক্ষ হয়ে নামতে হবে। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি সেই বিষয়ের একজন মাস্টার হতে পেরেছেন।

ইলন মাস্ক তাঁর স্পেস এক্স কোম্পানী শুরু করার আগে বহুদিন সময় নিয়েছেন রকেট ও স্পেসের বিষয়ে নিজের জ্ঞানকে ধারালো করতে। তিনি যখন শুরু করেছেন তার অনেক আগেই শুরু করার মত অর্থ তাঁর হাতে ছিল। বহু বাঘা বাঘা রকেট ও স্পেস বিশেষজ্ঞকে তিনি কাজে লাগিয়ে কোম্পানী শুরু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ব্যবসার জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় বানী গুলোর একটি “Be the master of your craft” মেনে তিনি আগে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়িয়ে তারপরই স্পেস এক্স শুরু করেছেন। এই দূরদর্শীতার কারণেই তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম সফল একজন উদ্যোক্তা।

আশরাফ সাহেবও যদি ভালোলাগার জায়গা থেকে আইসক্রিমের ব্যবসা করতে চান, তবে অবশ্যই তাঁকে আগে সেই ব্যাপারে খুঁটিনাটি সব জেনে নামতে হবে। তিনি মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ হলেও, আইসক্রিমের ক্রেতা আর টেক্সটাইল মেশিনারিজ ক্রেতাদের মাঝে আকাশপাতাল তফাত। বাজারও সম্পূর্ণ ভিন্ন। পন্য তো অবশ্যই ভিন্ন। কাজেই তাঁকে আগে এই নতুন ক্ষেত্র সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ বা মাস্টার হতে হবে – তবেই তিনি সফল হবেন।

আপনিও যদি এক ক্ষেত্রে চাকরি করে, অন্য ক্ষেত্রে ব্যবসায় নামতে চান – সেটা যেন ঝোঁকের মাথায় বা আবেগের বশে না হয়। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি সেই বিষয়ে যথেষ্ঠ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছেন। অন্যের ওপর নির্ভর করে কখনওই ব্যবসায়ে সফল হওয়া যায় না, আপনার যতই টাকা আর কানেকশন থাক না কেন। কাজেই পন্য বা সেবা তৈরী করার আগে নিজেকে সেই ফিল্ড এর উপযুক্ত করে গড়ে তুলুন।

০৯. আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রটিতে আপনার পর্যাপ্ত বন্ধু ও শুভাকাঙ্খী আছে
একজন ব্যবসায়ীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ গুলোর একটি হল তাঁর নেটওয়ার্ক। আপনার যদি সঠিক জায়গায় সঠিক লোক থাকে, তবে ব্যবসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সরকারী কর প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন সরবরাহকারী, পাইকার – ইত্যাদি জায়গায় বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ থাকা মানে আপনার ব্যবসায়ে অনেক সুবিধা হওয়া। প্রয়োজন মত ঋণ পাওয়া, ধারে পন্য পাওয়া, টেন্ডারে কাজ পাওয়া – ইত্যাদি বিষয়ে ‘পরিচিত’ মানুষ অনেক সাহায্য করতে পারে।

আপনার ব্যবসার পন্য বা সেবার উন্নয়নের সাথে সাথে এই সম্পর্কগুলোর উন্নয়নও জরুরী। ব্যবসা শুরুর অনেক আগেই আপনি আপনার সহপাঠী, আত্মীয়দের কে কে এসব পর্যায়ে আছে – তা খুঁজে বের করে এদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন। এছাড়ও সুযোগমত নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। এই সম্পর্কগুলো আপনার মূলধন হিসেবে কাজে লাগবে।

১০. প্রয়োজনে পরামর্শ দেয়ার জন্য ‘গুরু’ এবং পরামর্শক আপনার আছে
সঠিক জায়গায় সঠিক ‘বন্ধু’ থাকার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করুন প্রয়োজনের সময়ে পরামর্শ দেয়ার জন্য আপনার গুরু বা মেন্টর রয়েছেন। এটা একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য খুবই জরুরী।

এঁরা এমন মানুষ, যাঁরা আপনার কাজের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে সফল, এবং এঁরা আপনাকে স্নেহ করেন। কোনও বিষয়ে কনফিউশন থাকলে বা নতুন কিছু জানার থাকলে, অথবা নতুন কোনও পদক্ষেপ নেয়ার সময়ে তাঁদের কাছে আপনি সঠিক পরামর্শ চাইতে পারবেন। অন্তত একজন এমন গুরুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তারপরই পুরোপুরি ব্যবসায় নামুন।

এঁদের পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা আপনাকে দ্রুত অনেক দূর এগিয়ে দেবে। হয়তো নিজের অভিজ্ঞতার থেকে যা শিখতে আপনার এক বছর লাগতো, আপনি হয়তো তা এক ঘন্টার একটি কথপোকথনে তা শিখে ফেলবেন। এমননি আপনার চাকরি ছাড়ার সঠিক সময়টিও তিনি আপনাকে বলে দিতে পারবেন।

১১. চাপ ও আঘাত সামলানোর মত যথেষ্ঠ মানসিক দৃঢ়তা আপনি অর্জন করেছেন
পৃথিবীর কোনও ব্যবসায়ীই বলতে পারবেন না যে ব্যবসা করতে গিয়ে তাঁকে চাপ নিতে হয়নি বা বড় কোনও ধাক্কা সামলাতে হয়নি। সফল উদ্যোক্তা তাঁরাই যাঁরা চাপের মাঝেও ঠান্ডা মাথায় নিজের কাজ করে যেতে পারেন। যে কোনও ধাক্কা সামলানোর মত মানসিক দৃঢ়তা একজন সফল উদ্যোক্তার অপরিহার্য একটি গুণ।

একবারেই কেউ ব্যবসায়ে সফল হয় না, বার বার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে বিজয়ী হওয়ার নামই সাফল্য। আর ব্যবসার ক্ষেত্রে তো এটা আরও বেশি করে সত্যি। একটি নিরাপদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামাটাই একটা দারুন মানসিক চাপ। হয়তো আপনার ওপর আপনার বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান নির্ভরশীল। তাঁদের কথাও আপনাকে ভাবতে হয়। আর ব্যবসার চাপের পাশাপাশি এটা আরও বড় চাপ।

কখনও কখনও এমন হতেই পারে যে আপনার মনে হবে পুরো আকাশটা আপনার মাথায় ভেঙে পড়ছে, পৃথিবীর সব মাটি আপনাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছে। কিন্তু আপনাকে এর মাঝেই ঠান্ডা মাথায় কাজ করে যেতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে যে আপনি পারবেন।

এই মানসিক দৃঢ়তা হঠা‌ৎ করেই মানুষের মাঝে আসে না। ধীরে ধীরে একে গড়ে তুলতে হয়। ছোট ছোট চাপ সামলাতে সামলাতেই বড় চাপ সামলানোর মানসিক শক্তির জন্ম হয়। তাই চরম সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন আপনি যে কোনও পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। যে কোনও বিপর্যয়ে আশাবাদী থাকতে পারেন।

যদি মনে করেন, এই গুণ এখনও আপনি অর্জন করতে পারেননি, তবে নিজেকে আরও একটু সময় দিন। বিভিন্ন ভাবে নিজের ওপর পরীক্ষা করুন। ইচ্ছে করে নিজেকে চাপে ফেলে নিজের ক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি নিজের মানসিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে মেন্টাল মডেলিং দারুন সহায়তা করতে পারে। চর্চার মাধ্যমে নিজের মাঝে এই দৃঢ়তা নিয়ে আসা সম্ভব। কাজেই নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই ঝুঁকি নিন। অন্যথায় সেই ক্ষমতা নিজের মাঝে জন্ম দেয়ার জন্য আরেকটু সময় নিন।

পরিশিষ্ট
একটি নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবন ছেড়ে, আরও বড় সাফল্যের আশায় অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানো নি:সন্দেহে একটি সাহসী কাজ। এই সাহস করার কথা ভাবতেই পারে পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষ। এবং আপনি যদি তাঁদের একজন হন, তবে বলাই যায় আপনি একজন অসাধারন মানুষ।

অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে হলে ঝুঁকি নিতেই হয়। এটা ছাড়া কেউ পৃথিবীতে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু সেই ঝুঁকিও হতে হবে হিসেব করা। সফল ব্যবসায়ীরা সব সময়ে ঝুঁকি নেন মেপে মেপে। ঝুঁকির ফলে কি হতে যাচ্ছে তার একটা ধারণা তাঁদের আগে থেকেই থাকে। এতে করে তাঁদের কাজ করতেও অনেক সুবিধা হয়। আপনি অবশ্যই শুধুমাত্র আবেগ আর অন্ধ বিশ্বাসের বলে আপনার নিজের ও আপনার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে বাজি ধরবেন না।

হ্যাঁ – এটা সত্যি যে ব্যবসার জগতে ১০০% নিশ্চিত বলে কিছু নেই। সত্যি বলতে, মানুষের জীবনটাই অনিশ্চিত। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা আমাদের ভবিষ্য‌ৎকে বোঝার চেষ্টা করে সেই অনুযায়ী প্রস্তুত হব না।

অতি সাহস আর অতি বোকামীর মাঝে একটা সূক্ষ্ণ পর্দা আছে – সেই পর্দাটি হল পরিকল্পনা। বুদ্ধিমান সাহসী ব্যক্তিরা ঝুঁকি নেন ঠিকই, কিন্তু তার পেছনে তাঁদের পরিকল্পনা থাকে। একটি রোডম্যাপ তৈরী করে তাঁরা কাজ করেন বিধায় তাঁদের সফল হওয়ার রেট এত বেশি।

পরিকল্পনা হয়তো আপনাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু এটা আপনাকে অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। প্রবল অন্ধকারেও আপনার হাতে মশাল হয়ে জ্বলে এই প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা।

ওপরের ১১টি বিষয় আসলে উদ্যোক্তা হিসেবে চরম ঝুঁকি নেয়ার আগে আপনাকে পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করবে। পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মাঝে ঝাঁপ দিলে বিপদের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু যদি একটি রোডম্যাপ আপনার হাতে থাকে তবে সামনে এগিয়ে চলাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। সেই রোডম্যাপ তৈরীতে একটু সাহায্য করতেই এই লেখার অবতারণা।

আশা করি এই ১১টি পয়েন্ট আপনাকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে। আপনার সামান্য উপকারে আসতে পারলেও আমরা আমাদের প্রচেষ্টাকে সফল ধরে নেব।

লেখক: তামজিদ রহমান তথ্যসূত্র: লড়াকু ডটকম।



ব্লগটির ক্যাটাগরিঃ ক্যারিয়ার টিপস

-- ব্লগার মন্জুর আলী শাহ্ এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
8 0 4 6
আজকের প্রিয় পাঠক
2 2 9 7 3 0 2 2
মোট পাঠক