• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ মঙ্গলবার | ১৪ জুলাই, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৭:৩৬ অপরাহ্ন

Photo
আমার স্মৃতির পাতায় বীমাবিদ জামাল এম এ নাসের

করোনায় অনেকেই মারাগেছে, অনেক মৃত্যু সংবাদ শুনেছি কিন্তু এমন কষ্টের অনুভূতি কেন আগে হয়নি? এর মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারছি তিনি আমার কতটা আপন ছিলেন। এখন বুঝতে পারছি তিনি আমার রক্তের কেউ না হলেও, এটি বলতে পারি তিনি ছিলেন বীমাগুরু ও অভিভাবক, আমার পরম আত্তার আত্মীয়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- ‘জীবন বলে আমি তোমার মরণ তরী বাই’। সেই তরীর যাত্রী হয়ে অজানা-অচেনা এক জগতে পাড়ি দেয়া বীমা শিল্পের অহংকার, একজন সফল ও মেধাবী বীমাবিদ ও ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব জামাল এম এ নাসের শুধু একটি নাম নয়, তার বর্ণাঢ্য কর্ম জীবনে বীমা শিল্পের উন্নয়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রেখে গেছেন, যা বাংলাদেশের বীমা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার ২১/০৬/২০২০ ইং তারিখ ভোররাত ৩টা ৪৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সংবাদটি শুনে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউনর’ পড়তে খানিকটা সময় লেগেছিল। কোন ভাবেই বিশ্বাস করে যেন মেনে নিতে পাড়ছিলাম না। নিজের অজান্তেই দু’চখের কোনে খানিকটা  জল এসে ভির জমালো।

তখন ভাবছিলাম এই পৃথিবীতে চিরদিন কেউ  থাকবে না, এ সত্য আমাদের মেনে নিতেই হবে। কবিগুরু লেখা করেটি লাইন খুব মনে পড়তে লাগলো-

যেদিন প্রথম তুমি, এসেছিলে ভবে।
তুমি মাত্র কেঁদেছিলে, হেসেছিল সবে।
এমন জীবন হবে করিতে গঠন।
মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।

আমার শ্রদ্ধেয় বীমাগুরু জামাল এম এ নাসের কবিতার মতোই ভুবন কাঁদিয়ে গেলেন। সবচেয়ে বেশী আমার মনে পরছে, করোনায় অফিস বন্ধের কিছুদিন আগে, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর হেডঅফিসে স্যারের সাথে আনন্দময় কিছু মুহূর্তের কথা। আমার জানার তিব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ছুটে যেতাম স্যারের কাছে, তিনি কখনই আমাকে নিরাশ করেন নি। বরং সবসময় ‘বলতেন যখনি কাওরান বাজার আসবে তখন আমার অফিস হয়ে যাবে। যে কোন কিছু জানার জন্য ফোন দিবে’। আমার জানার কৌতুহলী স্বভাব তার ভালো লাগতো।  

আমার লেখা ২য় বই “বীমা ব্যবসায় অগ্রগতির কৌশল” এর কপি যখন স্যারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, তখন তার অফিস রুমে অনেকেই ছিলো। হাস্যজ্জল ভাবে আমার প্রশংসা করে বলেন ‘আমার ৩৫ বছর কর্মজীবনে অনেক কিছু করেছি কিন্তু এখনো নিজের লেখা একটি বই প্রকাশিত করা হলো না, মাহমুদের তো দুইটা বই প্রকাশিত হলো’ ঐ সময়ে স্যারের রুমে উপস্থিত থাকা পি,আর,ও জনি ভাই কে স্যার বল্লেন ‘এই বইটি আমাদের সকল সার্ভিসিং অফিস গুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন’। এই সুখকর স্মৃতি যেন কখনই ভুলবার নয়।  

জামাল এম এ নাসের স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে ১৯৮৪ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর তিনি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে একচ্যুয়ারিয়াল সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮৬ সালে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তন্মধ্যে সন্ধানী লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ, গোল্ডেন লাইফ এবং সর্বশেষ ন্যাশনাল লাইফে ২০১২ সাল থেকে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

যদিও স্যারের খুব বেশী সান্নিধ্য পাবার সুযোগ আমার হয় নি, তবে যতটুকু দেখেছি তাকে একজন মিষ্টভাষী, সদালাপী, উৎসাহী, গোছানো স্বভাবের, মেধাবী ও দক্ষ বীমা সংগঠক বলেই আমার মনে হয়েছে। আমি বীমা পেশায় প্রায় ১ যুগ সময় ধরে থাকবার ফলে এবং বিশেষ করে বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগ ওয়েবসাইট ইন্স্যুরেন্স বিডি নিউজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক কোম্পানীর মাননীয় মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ আমার হয়েছে। আমার দেখা জামাল এম এ নাসের স্যার বাংলাদেশের বীমা শিল্পে অদ্বিতীয়।

জামাল এম এ নাসের স্যার সেমিনারে খুবই চমৎকার ভাবে পেপার প্রেজেন্টেশন করতেন। তার অনেক সেমিনারে আমি অংশগ্রহণ করেছি। বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স একাডেমী ও বিআপিডির অনুষ্ঠানে স্যারের আলোচনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স এসোসিয়েশনের মিটিং এ দেখেছি সবসময় স্যার যৌতিক বিষয় তুলে ধরতেন। আমি অনেক সময়ে স্যার কে প্রশ্ন করতাম ‘স্যার কিভাবে এতো সুন্দর করে যৌতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেণ’ স্যার সামান্য হেসে উত্তর দিতেন ‘অনেক পড়াশুনা করতে হয়’। আমি যখন স্যারকে বলতাম ‘স্যার কিভাবে আপনার মতো বক্তব্য দিতে পারবো? কিভাবে আপনার মতো করে বীমা শিল্পে অবদান রাখতে পারবো’? স্যার সবসময় হেসে উত্তর দিতেন, একদিন বল্লেন ‘তুমিও বাংলাদেশের বীমা শিল্পে অবদান রাখতে শুরু করেছ’। আমি বিস্মিত হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আস্তে করে বল্লাম, স্যার কিভাবে? স্যার বল্লেন, ‘তুমি বীমা বিষয়ক বই লিখছ আবার তুমিই প্রথম বাংলাদেশে ইউটিউবে অগ্রগতি অনলাইন টিভি’র মাধ্যমে বীমা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছ’। স্যারের মতো এতো বড় গুনী বীমা ব্যক্তিত্বের মুখে আমার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি সরুপ কথা শুনে শিহরিত হয়ে উঠলাম।  

এখন আর এমন করে কে আমার প্রশংসা করবে? কে আমকে সাহস দিবে? কে আমাকে পরামর্শ দিবে? 

বর্তমানে লেখা চলমান বীমা বিষয়ক আমার ৪র্থ বই এ স্যার সাফল্যে গাথা অনেক স্মৃতি কথা ও সাক্ষাৎকার লিখা আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য স্যার আমার এই বইটি দেখে যেতে পারলেন না। স্যার জীবিত থাকলে কতই না খুশি হতেন বই দেখে। আর আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন। আমার জন্য কতইনা আনন্দঘন হতো সেই মুহূর্ত, কিন্তু এখন আমাদের দুঃখের সাগরে ভেসে দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।  

করোনার আগে যখন স্যারের সাথে শেষবার আমার দেখা হয়, তখন স্যার কে বলেছিলাম ‘স্যার অগ্রগতি অনলাইন টিভির জন্য আপনার সু-দীর্ঘ ইন্স্যুরেন্স ক্যারিয়ার সম্পর্কে ভিডিও সাক্ষাৎকার নিতে চাই’। স্যার আমাকে বলেছিলেন পড়ে একসময় এসো ভিডিও সাক্ষাৎকার দিবো। সেদিন না তিনি জানতে না আমি, সেই দেখাই হবে শেষ দেখা।  

বাংলাদেশে বীমা শিল্পের অহংকার, সফল ও মেধাবী বীমাবিদ জামাল এম এ নাসের তার বর্ণাঢ্য কর্ম জীবনে বীমা শিল্পে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। বীমা জগতে তিনি অনুস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে দেশের বীমা শিল্প অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন, আমিন।  তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশসহ তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি ৷


মোঃ মাহমুদুল ইসলাম
বীমা পরামর্শক ও প্রশিক্ষক
ইমেইলঃ mahmud.adviser@gmail.com



ব্লগটির ক্যাটাগরিঃ সাম্প্রতিক খবর , বীমা সংবাদ

-- ব্লগার মাহমুদুল ইসলাম এর অন্যান্য পোস্টঃ --
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
2 0 7 1 8
আজকের প্রিয় পাঠক
2 4 5 6 6 2 5 6
মোট পাঠক