• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ বুধবার | ২৩ জুন, ২০২১ | ৯ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৮:৩৯ অপরাহ্ন

Photo
ভারতের বীমা শিল্পের ইতিহাস

ভারতে আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রে বীমা ক্ষেত্রের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই লক্ষ্যে ১৯৫৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ২৫টি দেউলিয়া এবং আরও ২৫টি প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সংস্থা সহ ২৪৬টি দেশি-বিদেশি বেসরকারি বীমা সংস্থা জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবনবীমা কর্পোরেশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৭২ সালের ১৩৬টি বেসরকারি সাধারণ বীমা সংস্থার জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন গঠিত হয়। জীবনবীমার রাষ্ট্রায়ত্তকরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংসদে তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী সি ডি দেশমুখ বলেনঃ "Insurance is an essential service which a welfare state must make available to its people. The nationalization of life insurance will be another milestone on the road to the country has chosen to reach its goal of socialistic pattern of society. It is a measure conceived in a genuine spirit of service to the people."

তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার বীমা ব্যবসার রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পক্ষে যে যুক্তিগুলি হাজির করেছিল তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলোঃ ১) বেসরকারি বীমা সংস্থাগুলির উপর বীমাকারীদের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। ২) দুর্নীতি এবং বীমাকারীদের সঞ্চয়ের তছরূপের ঘটনা এখন নৈমত্তিক বিষয়। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, একটি বীমা সংস্থার চেয়ারম্যান এক প্রকল্পে ৩৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের ফলে যদি লাভ হয় তবে তা চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। আর লোকসান হলে তার দায় কোম্পানিকে গ্রহণ করতে হবে। এই তথ্যের উল্লেখ করে সি ডি দেশমুখ বলেনঃ "...... বর্তমানে জীবনবীমা যোগ্যতার সাথে এবং উপযুক্ত দায়িত্ব সহকারে কাজ করছে না। এর মধ্যে দিয়ে আমাদের অনুমানই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জীবনবীমাকে যে ধরণের দায়িত্ব পালন করা উচিত --- তা তারা করছে না এবং নতুন ধরনের আইন প্রয়োগ করে এই পরিস্থিতির উন্নতি বিধান করা যাবে না। পরিস্থিতি পূর্বের ন্যায়ই রয়ে যাবে। মালিকানার ধরনেই পরিবর্তন প্রয়োজন --- এক্ষেত্রে জাতীয়করণই হবে উপযুক্ত পদক্ষেপ। "

জীবনবীমা রাষ্ট্রায়ত্ত হওয়ার পূর্বে বিড়লা পরিবারের মালিকানাধীন ছিল রুবি জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানি, নিউ এশিয়াটিক, বোম্বে লাইফ। টাটা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল নিউ ইন্ডিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানি, ডালমিয়া-জৈনদের দখলে ছিল ভারত ইনসিওরেন্স। এরা বীমাকারীদের স্বার্থরক্ষা তো করতই না, এমনকি ছিল না কোনো দায়বদ্ধতা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা সংস্থার উপর বেসরকারিকরণের আক্রমণ নব্য-উদারনীতি গ্রহণের পর শুরু হয়। এই লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে গঠিত হয় আর এন মালহোত্রা'র নেতৃত্বাধীন কমিটি। ১৯৯৪ সালের ৭ই জানুয়ারি কমিটি তার রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্টে বলা হয়ঃ ১) এল আই সি-জি আই সি'র বেসরকারিকরণ, ২) বিদেশী সংস্থাকে উভয় ক্ষেত্রে প্রবেশের অনুমতি প্রদান, ৩) এল আই সি-জি আই সি-র সম্প্রসারণ বন্ধ, ৪) বীমা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন।

মালহোত্রা কমিটির সুপারিশের সূত্র ধরে আই আর ডি এ-সহ বিভিন্ন ধরনের বিল সংসদে পেশ হয়েছে ও আইনে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে বীমা বিল ২০০৮ সংসদের উভয় কক্ষে অনুমোদিত হয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো, বীমা ব্যবসাকে ক্রমান্বয়ে দেশি-বিদেশি পুঁজির নিকট উন্মুক্ত করে দেওয়া। ইতিমধ্যে দেশি বেসরকারি সংস্থায় বিদেশি পুঁজির উর্ধ্বসীমা ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৪৯ শতাংশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য ভারতে বীমা ব্যবসায় সম্প্রসারণের যে সম্ভাবনা আছে তা পূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা সংস্থা অপারগ। বস্তুতপক্ষে, এই বক্তব্য ভিত্তিহীন।

বীমার প্রসার দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

Photo

যেমন ভারতের ছয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বীমার প্রসার ২.২৩ শতাংশ, সেখানে অর্থনৈতিকভাবে ১৩টি নিচের সারির রাজ্যে বীমার প্রসার ০.৪৬ শতাংশ। সাধারণ বীমার প্রসার দিল্লিতে ১.৪ শতাংশ এবং বীমার ঘনত্ব ২৯৯৪ টাকা, কিন্তু উত্তরপ্রদেশে এই হার যথাক্রমে ০.৪৭ শতাংশ এবং ১৮৩ টাকা। অর্থাৎ, অসম অর্থনৈতিক অবস্থাই বীমা ব্যবস্থা প্রসারের সামনে বড় বাধা। তথাপি রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা ও বেসরকারি বীমার কার্যকলাপের তুলনা করা যেতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা সংস্থা দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি। পলিসির সংখ্যার বিচারে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবনবীমা বিশ্বের বৃহত্তম সংস্থা। এর পলিসির সংখ্যা ৪১ কোটি ৫৪ লক্ষ। লাইফ ফান্ডের পরিমাণ ১৭ লক্ষ কোটি টাকা। গত বছরে ফার্স্ট প্রিমিয়াম বাবদ আয়ের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা যা সমগ্র প্রিমিয়ামের প্রায় ৮৪ শতাংশ। ডিভিডেন্ট বাবদ কেন্দ্রীয় সরকারকে দিয়েছে ১৮০৩ কোটি টাকা। জীবনবীমার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ সর্বশেষ বছরে ছিল ৪ লক্ষ ৭ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা কোম্পানি ডিভিডেন্ট বাবদ কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে ৫৯৮.৬৬ কোটি টাকা। সরকারি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এল আই সি'র বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে জোবনবীমা বিপুল পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ইতমধ্যে এল আই সি ৪ লক্ষ ৫২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। অন্য কোনো আর্থিক সংস্থার এই বিপুল অবদান নেই। প্রসঙ্গত, এল আই সি সর্ববৃহৎ আয়করদাতাও।

ভারতে বর্তমানে ২৩টি বেসরকারি জীবনবীমা ও ২৪টি সাধারণ বীমা কোম্পানি ২৬ শতাংশ (সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৪৯ শতাংশ) বিদেশি পুঁজির অংশীদারিত্ব নিয়ে ব্যবসা করছে। বীমা ব্যবসা উন্মুক্তকরণের পর ২০১৩ সালে এই ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজির পরিমাণ ছিল ৬০৬৪ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমায় পুঁজির পরিমাণ ৫৯৭৫ কোটি টাকা। দেশের পরিকাঠামো শিল্পে এল আই সি-র বিনিয়োগ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং জি আই সি-র বিনিয়োগ ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বেসরকারি বীমা সংস্থাগুলির বিনিয়োগ অত্যন্ত সামান্য। সম্প্রতি ভারতীয় রেল পরিকাঠামো উন্নয়নে ৩০ বছরের মেয়াদে এল আই সি দেড় লক্ষ কোটি টাকা আগামী পাঁচ বছরে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছর রেলকে এই টাকার সুদ বা আসল শোধ করতে হবে না। সুদের হারও বাজার দর থেকে কম। দেশের স্বার্থে কোনো বেসরকারি সংস্থা কি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?

তথ্য সূত্রঃ দেশহিতৈষীর সম্পাদক প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে সংগৃহীত যা প্রকাশিত হয় দেশহিতৈষী শারদ সংখ্যা ১৪২৫। । ২০১৮-তে।


-- ব্লগার Rajib Khan এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
2 1 2 0 4
আজকের প্রিয় পাঠক
3 4 3 6 5 8 2 5
মোট পাঠক