• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ বুধবার | ২৩ জুন, ২০২১ | ৯ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

Photo
উন্নত বিশ্বে যে কোন পেশা হতে বীমা পেশাই সর্বাধিক সম্মানিত পেশা হিসেবে স্বীকৃত

২০১০ সালের একটি ১০০% বাস্তবিক ঘটনায় প্রমাণিত! উন্নত বিশ্বে অন্যান্য যে কোন পেশা হতে বীমা পেশাই সর্বাধিক সম্মানিত পেশা হিসেবে স্বীকৃত,,,

আমার এক ফিল্ড অফিসার এর সাথে এপ্রিল মে মাসের কোন এক সময় ঢাকা জজ কোর্টে অ্যাডভোকেট রানা সাহেবের কাছে যাই বীমা বিক্রয়ের জন্য। বেলা আনুমানিক সাড়ে চার বা পাঁচটা হবে। কোর্ট মুলতবি শেষে ভদ্রলোক তাঁর মক্কেলদের বিভিন্ন বিষয় বুঝাচ্ছিলেন। আমরা হাজির হয়ে সালাম দিলাম। রানা সাহেবের চেম্বারটি খুবই বড় ও সাজানো গোছানো। দেখেই বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক অনেক বড় বা সিনিয়র একজন অ্যাডভোকেট। সালাম গ্রহন করে বসার সুযোগ করে দিলেন, সত্যি কথা হলো আমি নিজেই কিছুটা নার্ভাস ফিল করছি মনে মনে। একটু পর রানা সাহেবের সাথে আলোচনা শুরু হলো। তিনি সংক্ষেপে কিছু শুনে তাঁর নিজের কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর স্ত্রী সন্তান কানাডা থাকেন কয়েক বছর আগে থেকেই। সূত্রাপুর এলাকায় নিজের একটি পাঁচ তলা বাড়ি আছে, মা সাথে থাকে, দের লক্ষ টাকা ভাড়া পান বটে, নিজে একটি টাকাও গ্রহন করেন না। কিছুদিনের মধ্যেই নিজেও কানাডা চলে যাবেন স্হায়ী ভাবে। সবকিছু মিলে তিনি বীমা গ্রহনে অপারগতা প্রকাশ করলেন, আমাকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে সবিনয়ে বীমা না করার বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ জানালেন। অগত্যা ব্যর্থ হয়ে আমাকে ফিরে আসতে হলো।

দুই মাস পরের ঘটনা। আমি স্বভাবতই একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। সকাল আনুমানিক পোনে আটটা, মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। বিরক্তি নিয়েই ফোনটি রিসিভ করি। ওপ্রান্ত হতে খুবই বিনয়ী কন্ঠে সালাম দিলেন, আমি সালাম নিয়ে কে কে বললে ওপ্রান্ত হতে স্যার স্যার আমি অ্যাডভোকেট রানা সাহেব বলছি। প্রথমে মনেই করতে পারছিলাম না, বার বার একই পরিচয় দিয়ে আমার এফ এ পপি বেগমের কথা বলে মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। অবশেষে চিনতে পারলাম ও অবাক হলাম। ঘুমের ভাব কাটিয়ে ফিরে সালাম দিলাম। স্যার কেমন আছেন? রানা সাহেব ঃ স্যার ভাল আছি আলহামদুলিল্লাহ। আমি একটি কঠিন সমস্যায় পড়ে আপনার স্মরণাপন্ন হলাম। অনুগ্রহ করে আমার একটা উপকার করে দিবেন, প্লিজ? আমি খুব কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম কি বিষয়ে? তিনি বললেন স্যার আমি আপনার অফিসে আসলে আপনাকে কখন পাবো? আমি বললাম স্যার আমি নিজেই আপনার চেম্বারে চলে আসছি। তিনি সবিনয়ে না করে এক ঘন্টার মধ্যে আমার অফিস আসছেন বলে জানালেন। আমি জি ঠিক আছে স্যার বলে খুব দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নাস্তা না খেয়ে রওয়ানা হলাম। এসে দেখি রানা সাহেব আমার ফিল্ড অফিসার পপি বেগমকে নিয়ে একটু আগেই হাজির হয়ে গিয়েছেন।

চেম্বার খুলে বসলাম, নাস্তার অর্ডার করলাম সকলের জন্য, নাস্তা আসলো এবং সবাই একসাথে নাস্তা করলাম। ভদ্রলোক সিগারেট খান, আমিও তাই। একসাথে সিগারেট ধরালাম। সিগারেট হাতে নিয়েই চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। সবিনয়ে রিলাক্স মুডে জানতে চাইলাম স্যার কি এমন সমস্যা যার সমাধানের জন্য আমার কাছে আপনাকেই আসতে হলো? তিনি শুরু করলেনঃ স্যার আপনি তো জানেন (সেই দিন বলেছিল) আমার স্ত্রী সন্তান কানাডার সিটিজেনশিপ নিয়ে সেখানেই আছেন, তিনি গত কয়েক বছর যাবত আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ব্যাটে বলে মিলছে না যাওয়াও হচ্ছে না। আমি বললাম আপনি তো অনেক বড় আইনজীবী, কানাডায় আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করার যথেষ্ট যোগ্যতা তো আপনার আছে, সে পেশায় গেলেই তো হয়। রানা সাহেব উত্তর করলেন, জি স্যার, আইনজীবী হিসেবে সেখানে মুভ করার সর্ব যোগ্যতাই আমার আছে, আর সে সুযোগও আমার আছে। গত তিন দিন আগে আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করে জানালো আইনজীবী হিসেবে আমার ভিসা কনফার্ম আছে, তবে সেখানে মাসে আমার আয় ৩২,০০০/ কানাডিয়ান ডলার সম্মানী আসবে, তবে একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানির একজন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য একটি ভিসা তিনি পেয়েছেন, সেখানে মাসে নূন্যতম ৭৪,০০০/ চুয়াত্তর হাজার কানাডিয়ান ডলার সম্মানী পাওয়া যাবে, যদি আমি নূন্যতম পাঁচ বছর একটি বড় পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সার্টিফিকেট দাখিল করতে পারি। আরও বললেন, স্যার সেখানে একজন আইনজীবী হতে নাকি একজন ইনসিওরেন্স কর্মকর্তার সম্মান বহুগুণ বেশি। খুব ভাবতে ভাবতে আপনার কথা মনে পড়লো, তাই আপনার কাছে আসা। এতক্ষণে পুরো বিষয়টি বুঝতে পারলাম। আমি তাঁকে সবিনয়ে বললাম স্যার বড় কর্মকর্তা হিসেবে আপনাকে জয়েন্ট করানোটা খুব কঠিন কাজ নয়, তবে সেটা পাঁচ বছর আগে হতে কিভাবে সম্ভব! তাছাড়া আপনার এবিষয়ে তো তেমন কোন অভিজ্ঞতাও নেই, সেখানে কিভাবে কি করবেন। তিনি খুব অনুরোধ করে ব্যবস্থা করতে বললেন আর অভিজ্ঞতা সমস্যা সমাধানের জন্য আমার স্ত্রী সেখানে একজনের সাথে দুই মাসের জন্য কন্টাক্ট করেছেন, আমি যাওয়ার পর ওই দুই মাসে তিনি আমাকে সর্ববিষয়ে স্পেশাল প্রশিক্ষণ দিয়ে অভিজ্ঞ করে গড়ে তুলে তারপর জয়েন্ট করাবেন। বীমা পেশায় এত এত সম্মান ও মূল্যায়ন যদি আগে জানতাম তাহলে আইনজীবী না হয়ে বীমাকর্মি হতাম। আপনি যে করেই হোক আমাকে যা কিছুর বিনিময়ে হোক একটু ব্যবস্থা করুন, প্লিজ।

আমি চেয়ার হতে উঠে বারান্দায় গিয়ে সিনিয়র স্যারের সাথে ফোনে পুরো বিষয়টি শেয়ার করলাম ও অনুরোধ করলাম কিছু করার জন্য। স্যার আধা ঘন্টা পর জানাবেন বলে ফোন রেখে দিলেন। দশ পনের মিনিট পর আবার স্যার ফোন করলেন আমাকে, বললেন অ্যাডভোকেট রানা সাহেব যেহেতু একজন সিনিয়র আইনজীবী, উচ্চ শিক্ষিত ও স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সেহেতু বিশেষ বিবেচনায় ডিজিএম(উঃ) পদে পাঁচ বছর আগে পেশা ছেড়ে চলে গিয়েছে ওই পদে রানিং অবস্থায় নিয়োগ দেয়া সম্ভব। তবে অন্ততঃ দুই লক্ষ টাকার নতুন প্রিমিয়াম লাগবে। রানা সাহেবকে জানালে তিনি আনন্দের সাথেই রাজি হয়ে যান। তাঁর নিজের নামে দশ লক্ষ টাকার ও সাথে থাকা তাঁর শ্যালিকার নামে দশ লক্ষ টাকার দুটি পলিসি গ্রহ করলেন যার মোট প্রিমিয়াম এলো পোনে দুই লক্ষ টাকা। উক্ত টাকার এক লক্ষ টাকা তিনি সাথে সাথেই পরিশোধ করলেন, আর বাকী টাকা ও প্রয়োজনীয় সকল চাহিদার কাগজ পত্র ইত্যাদি সহ টাকা নিয়ে পরদিন আসবেন বলে খুবই কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নিলেন। পরদিন শ্যালিকা সহ আবার যথা সময়ে হাজির, সার্বিক বিষয় প্রসেসিং করা শুরু করি, রানা সাহেব প্রিমিয়াম এর বকেয়া ৭৫,০০০/ টাকার বদলে ৮০,০০০/ টাকা আমাকে দিলেন এবং বললেন স্যার আপনার সিনিয়র স্যার এর জন্য একটা গিপ্টকিনে দিবেন। আমি সবিনয়ে লাগবে না বলে ফেরত দিতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলাম। পরে অফিসের সবাই মিলে রানা সাহেব সহ তা দিয়ে মিষ্টি খুব করলাম। আমি বীমার পরবর্তী প্রিমিয়াম কে দিবে জানতে চাইলে রানা সাহেব তাঁর শ্যালিকাকে সুত্রাপুর এর বাড়ী ভারা হতে উভয় বীমার প্রিমিয়াম জমা দিতে দিকনির্দেশনা দিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই রানা সাহেবের বীমা ও নিয়োগ পত্রের কপি তাঁর হাতে হস্তান্তর করার পর তিনি আরেকটি অনুরোধ করলেন, স্যার কানাডার কোম্পানি হতে আপনার এই কোম্পানির কাছে আমার বিষয়ে তদন্ত আসবে হয়তো সরাসরি নয়তো ফোন করবে। তখনও আমাকে একটু সহযোগিতা করতে হবে স্যার। আমি ও আমার সিনিয়র স্যার সার্বিক বিষয়ে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার নিশ্চয়তা দিলাম, তিনি খুবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নিলেন।

এরপর, কিছু দিন পরপরই রানা সাহেব খোঁজ নিতে লাগলেন স্যার কানাডা হতে কোন ফোন এসেছে? আমি না না বলতে বলতে প্রায় চার মাস পর হঠাৎ ফোন আসলো। সংক্ষেপে কিছু কথা বলার পর আমার পরিচয় জানতে চাইলে আমি ব্রাঞ্চ ইনচার্জ জানালে হেড অফিসের নাম্বার চাইলে আমি সিনিয়র স্যারের মোবাইল নাম্বার ও টিএন্ডটি নাম্বার দিলাম, পরে স্যারকে সব শেয়ার করলাম, স্যার ঠিক আছে বললেন। পরদিন স্যার জানালেন আপনার রানা সাহেবের কাজ হয়ে গিয়েছে, রানা সাহেবকে জানালাম। তিনি খুন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কৃতজ্ঞতা জানালেন।

এর দুই মাস পর আবার রানা সাহেবের ফোন, স্যার ভাল আছেন? স্যার দোয়া করবেন আজ রাতেই কানাডার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়ছি। এরপর তিন চার মাস পর আবার রানা সাহেবের ফোন, স্যার ভাল আছেন? স্যার কি যে বলব, যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু পেয়েছি। পৃথিবীর উন্নত দেশে বীমা পেশাজীবীদের এত সম্মান আর মূল্যায়ন তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমাদের দেশের জনগণ, বীমাপেশাজীবি ও সরকার কেউই বীমা সম্পর্কে এতটা সচেতন নয় বলে আমাদের দেশের বী সেক্টর অনেক পিছিয়ে আছে। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের অক্লান্তিক পরিশ্রম, প্রচেষ্টা ও সরকারের বীমার প্রতি গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন পদক্ষেপ এর মাধ্যমে আমাদের দেশেও একদিন একসময় বীমা পশা সর্বোচ্চ সম্মানের পেশা হিসেবে মূল্যায়িত হবে বলে বিশ্বাস করি। এর পর হতে জনাব রানা সাহেবের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি।

এ-থেকেই আমরা বুঝতে ও জানতে পারছি ও বিশ্বাস করার সুযোগ পাচ্ছি, বীমা পেশা কোন সাধারণ পেশা নয়, উন্নত বিশ্বে বীমা পেশা অত্যন্ত সম্মানিত ও গৌরবের পেশা। আমরাও আমাদেরকে সে গৌরবের অংশীদারত্বের জন্য সঠিক ভাবে পেশাকে মূল্যায়ন করে সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারলে নিজেরাও সঠিক ভাবে সম্মানিত ও গর্বিত হতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

মোঃ শরীফুল আলম
সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (উঃ) ও সার্ভিস সেল ইনচার্জ
কুতুবখালি সার্ভিস সেল, ৩১৮/৭/২ দঃ যাত্রাবাড়ী
রুপালী লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিঃ



ব্লগটির ক্যাটাগরিঃ পাঠক কলাম

-- ব্লগার Insurance BD Group এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
2 2 4 7 3
আজকের প্রিয় পাঠক
3 4 3 6 7 0 9 4
মোট পাঠক