• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ বুধবার | ২৩ জুন, ২০২১ | ৯ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৮:৪২ অপরাহ্ন

Photo
ঝুঁকি কমানোর পথের নাম 'বীমা'

মাত্রই পঞ্চাশ পেরোনো সরোয়ার আলম খুলনায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন। তার আয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারটির সংসার চলছিল। সঞ্চয়ও তেমন কিছু ছিল না। তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। বাকি দুই মেয়ের বড়জনের বিয়ে দিয়েছেন। ছোটটি কলেজে। এরই মধ্যে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সরোয়ার আলম। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি পড়ে অকুলপাথারে।

একই অবস্থা হয় অগ্নিকাণ্ডে সব পুড়ে যাওয়া অসংখ্য ছোট্ট দোকানি থেকে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরও। চোখের সামনে আগুনে যখন মালপত্র পুড়তে থাকে, তখন যেন স্বপ্নও পুড়তে থাকে তার। হঠাৎ দুর্ঘটনায় আয় হারিয়ে দেখা দেয় মহাবিপদ। চাইলে নিজের ও পরিবারের এমন কঠিন অনিশ্চিত সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি রাখা সম্ভব। শুধু জীবন নয়, ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য গড়া সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। ঝুঁকি কমানোর এ পথের নাম 'বীমা'।

শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রের উন্নয়নেও বীমা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে বীমা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে দেশটিতে বীমার প্রিমিয়াম আয় ছিল ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১১২ লাখ কোটি টাকা। এর ৫২ শতাংশ এসেছে জীবন বীমা থেকে। প্রতিবেশী ভারতে গত বছর বীমা খাতে প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। অথচ বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত এক দশকে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বীমা পলিসি বিক্রি করে।

উন্নত বিশ্বের মানুষের আয় বেশি। ফলে ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষাও তাদের বেশি। তারপরও বীমা সুরক্ষা নেওয়াকে তারা অত্যাবশ্যক পণ্য কেনার মতো মনে করেন। এর ওপর আছে বাধ্যতামূলক বীমা। ঠিক বিপরীত অবস্থান বাংলাদেশের। এখানে মানুষের আয় কম। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও থাকে কম। অথচ দেশের মানুষই সবচেয়ে কম বীমা করেন। নেই বাধ্যতামূলক বীমা পলিসিও। শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য গ্রুপ বীমা করার সুযোগ থাকলেও কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক খরচ কমাতে সে পথে যান না।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার সচেতনতা বাড়াতে বীমা দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৬০ সালে আলফা ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগদানের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবস পালনের ঘোষণা করা হয়।

বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেন জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ বীমার আওতাধীন। অথচ জনসংখ্যা বিবেচনায় দেশের অন্তত ১২ কোটি মানুষের বীমার আওতায় থাকা উচিত ছিল। এমন পরিস্থিতির কারণ জানতে চাইলে অর্থের সংস্থানের অভাবকে এর প্রধান কারণ বলে জানান বেশিরভাগ মানুষ।

ঢাকার একটি কোম্পানির বিপণন কর্মকর্তা মহিদুল হক বলেন, বীমা করা ভালো। কিন্তু দুর্মূল্যের বাজারে বেতনের টাকায় সংসার চালানো যেখানে কঠিন, সেখানে বীমা প্রিমিয়াম খরচ বাড়তি মনে হয়।

Photo

তাছাড়া বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ে অনেক প্রতারণার অভিযোগ আছে। পরিচিত সবার কাছেই শোনা যায়, বীমা দাবি পেতে ভোগান্তি হয়। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও বীমা করতে মন চায় না।

বীমা খাতের পিছিয়ে থাকার জন্য এগুলোকে কারণ বলে স্বীকার করলেও অসচেতনতাই বড় কারণ বলে মনে করেন বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি ও পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, সামর্থ্য অনুযায়ী সব মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বীমা পলিসি আছে। চাইলে কেউ মাসিক ১০০ টাকা দিয়েও বীমা করতে পারেন।

এবারের বীমা দিবসে বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা চালু হতে যাচ্ছে। বছরে মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে দুই লাখ টাকার বীমা সুরক্ষা মিলবে। একই সঙ্গে বছরে সন্তানপ্রতি মাত্র ৮৫ টাকায় বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবীমা চালু করা হচ্ছে। অভিভাবকের অবর্তমানে তার সন্তান মাসে ৫০০ টাকার শিক্ষাবৃত্তি পাবে। এ খরচ বহন করার ক্ষমতা মুটে-মজুর বা শ্রমিক থেকে সবার আছে। খুব অল্প প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবীমাও আছে। সমস্যাটা হলো মানুষ বীমা বিষয়ে সচেতন নন, অনেকে জানেনই না। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোও যথেষ্ট প্রচার করছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।

একই রকম কথা বলেন ইন্স্যুরেন্স ফোরামের মহাসচিব ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ইমাম শাহীন। তিনি বলেন, সবার জীবনেই ঝুঁকি আছে। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা রোগে অল্প বয়সী মানুষও মারা যাচ্ছেন বা পঙ্গুত্ববরণ করছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় গাড়ি নষ্ট হচ্ছে বা অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কারখানা ধ্বংস হচ্ছে। আকস্মিক দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পদহানির পর স্বজনদের সবাই সমবেদনা জানান, কিন্তু আর্থিক সহায়তা নিয়ে ক'জনই বা এগিয়ে আসেন। বীমাই পারে এমন বিপদে পাশে দাঁড়াতে।

বীমা করায় মানুষের অনীহার আরও একটি বড় কারণ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি অনাস্থা। এটা দূর করতে কোম্পানিগুলোকে আরও প্রচারে যেতে হবে বলে মনে করেন ইমাম শাহীন। তিনি বলেন, সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ হলে অনাস্থা কেটে যাবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, বীমা করলে ক্ষতির থেকে লাভ বেশি। চাইলে একজন মুদি দোকানিও তার সম্পদের বীমা করতে পারেন।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, অভিযোগ ক্রমেই কমে আসছে। কারণ, বীমায় অনিয়ম কমাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে। মাসের নির্দিষ্ট বুধবার বীমা দাবি পরিশোধ হচ্ছে। এখন আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সব কোম্পানি খারাপ নয়। দেখেশুনে ভালো কোম্পানিতে বীমা করলে সমস্যা থাকে না।

তবে বীমার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত কোম্পানি এবং অসম প্রতিযোগিতাও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করেন এ খাতের কেউ কেউ। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা জানান, ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে বীমা কোম্পানি মাত্র ৫৭টি। অথচ ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে কোম্পানি ৭৯টি। এর মধ্যে ৪৬টি সাধারণ এবং ৩৩টি জীবন বীমা কোম্পানি। এখানে যথেষ্ট দক্ষ জনবল নেই। ফলে যথেচ্ছ কর্মী নিয়োগে খারাপ মানুষও বীমায় ঢুকছে।



ব্লগটির ক্যাটাগরিঃ বীমা সচেতনতা , বীমা পরামর্শ

-- ব্লগার Admin Post এর অন্যান্য পোস্টঃ --
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
2 1 2 6 7
আজকের প্রিয় পাঠক
3 4 3 6 5 8 9 7
মোট পাঠক