• বীমা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্টি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বীমা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম
আজ মঙ্গলবার | ০৩ আগস্ট, ২০২১ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | সময়ঃ ০৭:৪২ পূর্বাহ্ন

Photo
বীমা ও জীবন

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। আমাদের জীবন অনেকটাই গ্রামনির্ভর। গ্রামের ফল, ফসল, গবাদিপশু, শাক-সবজি, হাট-বাজার জাতীয় অর্থনীতির বৃহৎ চালিকা শক্তি। স্বাভাবিকভাবে বীমা ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ জীবন বীমা কোম্পানি ক্ষুদ্র-বীমার মাধ্যমে বীমাসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস গ্রহণ করেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানি এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং গণবীমা ও গ্রামীণ বীমা নামে দুটি প্রকল্প চালু করেছে প্রায় তিন দশক আগে। অন্যান্য জীবন বীমা কোম্পানিও একই ধারা অনুসরণ করে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র-বীমার সেবা দ্বারা সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এ ধরনের প্রয়াস বীমাবাজার বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হলেও বাস্তবে তেমনটি হয়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ক্ষুদ্র-বীমার তামাদির হার প্রচলিত জীবন বীমার চেয়ে অনেক বেশি।

গ্রামের বা শহরের অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষের জন্য মাসিক কিস্তির ভিত্তিতে প্রিমিয়াম আদায় করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথম বছরেই প্রায় ৩০ শতাংশ পলিসি গ্রাহক সারা বছর প্রিমিয়াম দেন না। ফলে ঝরে যাওয়া পলিসির সংখ্যা ক্ষুদ্র-বীমা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অপেক্ষাকৃত স্বল্প-আয়ের অনেক মানুষ পলিসি দুই বছর চালু রাখতে সক্ষম হয় না। দুই বছরের মধ্যে পলিসি তামাদি হয়ে গেলে কোনো সমর্পণ মূল্য প্রদেয় হয় না। মেয়াদান্তে কোনো অর্থ পরিশোধ করা নাও হতে পারে। ফলে গরিব মানুষের ক্ষুদ্রসঞ্চয় পুরোপরি নষ্ট হয়ে যায়। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ যখন এভাবে বঞ্চিত হতে থাকে তখন বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের ধারণা আরও খারাপ হয়। বঞ্চিত এসব মানুষ ভবিষ্যতে আর বীমার প্রতি আগ্রহী হয় না।

বর্তমান বাস্তবতায় ক্ষুদ্র-বীমার দ্বারা বীমাশিল্পের বাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বিধায় বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বীমা পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক বা বীমা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষেরা বীমা কর্মীদের মিথ্যা আশ্বাস ও প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন। তাদের প্রতারণার হাত থেকে মুক্ত করতে না পারলে জীবন বীমাশিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হতে বাঁধ্য। তাই বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা আশু প্রয়োজন। বীমাশিল্পের ভাবমূর্তি তৈরির জন্য এ ব্যাপারে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে বীমা পেশাজীবীদের।

ক্ষুদ্র-বীমা বিশ্বে এখন এক অতি আলোচিত বিষয়। প্রতি মাসেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্র-বীমার ওপর একাধিক সেমিনার ও সম্মেলন হয়ে থাকে। পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও বীমা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিবৃন্দ ক্ষুদ্র-বীমার সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করে থাকেন। সাধারণত সম্মেলনে থিওরিসর্বস্ব আলোচনা এবং কিছু কিছু স্টাডি এসব সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র-বীমার সমস্যা ও করণীয় নিয়ে যেক’টি সম্মেলন বা সেমিনার হয়েছে তার ফল প্রায় শূন্য। কেননা ক্ষুদ্র-বীমার বর্তমান পদ্ধতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন এখনও নিয়ে আসা হয়নি। ফলে বীমাশিল্পের একটি বিকাশমান ধারার প্রতিক্রিয়ায় যে সব নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ অচলাবস্থা দূরীকরণে বাংলাদেশের সব ক্ষুদ্র-বীমাকারীর একটি কর্মশালা হওয়া প্রয়োজন। যেখানে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বীমাকারীদের সবাই ক্ষুদ্র-বীমার ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফল বা বাজারে এর প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে পারে। সেই সঙ্গে কীভাবে সমন্বিত প্রয়াস ও উদ্যোগ নেয়ার ফলে ক্ষুদ্র-বীমার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায় তা নিরূপণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রতিটি কোম্পানি নিজে নিজে যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তা খুব বেশি ফল বয়ে আনছে না। ফলে সমন্বিত ও সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অতি জরুরি।

ক্ষুদ্র-বীমার বাজারে অনেক বেসরকারি ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা বীমাসেবা বিতরণ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের প্রচলিত বীমা আইন ২০১০-এর আওতাধীনে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিবন্ধিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আপাতঃ বিরোধী হলেও কঠিন সত্য এই যে আইনের এ প্রয়োগে এ পর্যন্ত কেউ কোনো সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সম্প্রতি ‘ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষ’ আইনে বেসরকারি (এনজিও) ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থারা ঋণগ্রহীতারদের বীমা সুবিধা দিতে পারবে মর্মে বিধান করা হয়েছে। নতুন বলবৎ বীমা আইনে বলা হয়েছে, বীমাসেবা প্রদানকারী সব সংস্থাকে বীমা আইনের অধীনে নিবন্ধন করতে হবে।
দুটি বিদ্যমান আইনের বিধান সাংঘর্ষিক মনে হলেও এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বীমা আইনের অধীনে নিবন্ধন নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষ বা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষ বিধির দ্বারা বাঁধ্য করতে পারে। এ পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষই এ ধরনের বিধি বা প্রবিধান তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে এনজিওগুলোর পরিচালিত ক্ষুদ্রবীমা প্রকারান্তে নিয়ন্¿ণহীনভাবে জনসাধারণের কাছে বীমা সেবা দিচ্ছে। গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণœ হলে তা রক্ষা করার দায়িত্ব বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষের। সুতরাং বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার লাখ লাখ বীমাগ্রহীতার স্বার্থ সংরক্ষণে তাগিদে ক্ষুদ্র-বীমার জন্য বিধি বা প্রবিধান প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

বীমা আইন ২০১০-এ প্রায় অর্ধশত বিধি ও প্রবিধান প্রণয়নের বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও ক্ষুদ্র-বীমার জন্য কোনো বিধি বা প্রবিধান প্রণয়নের কোনো নির্দেশিকা নেই। বীমা আইনে উল্লেখ না থাকলেও উন্নয়ন ও বিকাশের স্বার্থে ক্ষুদ্র-বীমার বাজারজাতকরণ ও গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য পৃথক বিধি/প্রবিধান প্রণয়ন করা যেতে পারে। ভারতে ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র-বীমার জন্য একটি প্রবিধান প্রণীত হয়েছে। সেখানে ক্ষুদ্র-বীমার সেবা ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশেও অনুরূপ প্রবিধান প্রণীত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে প্রভাব সৃষ্টি করেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র-বীমার ক্ষেত্রে একটি ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য ক্ষুদ্র-বীমার বিকাশের স্বার্থে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র-বীমা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সব বিধি, প্রবিধান প্রণীত হওয়া প্রয়োজন সে সম্পর্কে সরকার এবং বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উচিত তা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশে এনজিওগুলোর দ্বারা পরিচালিত ক্ষুদ্র-বীমা সেবার উন্নয়নে উৎসাহ প্রদান করা এবং এ শিল্পের উন্নয়নে সব বিষয়ে সরকারকে এবং ক্ষুদ্র-বীমা সেবা প্রদানকারী সব বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এছাড়াও বীমাকারী, মধ্যস্থতাকারী, বীমা প্রতিনিধিদের আচরণবিধি ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নিয়মাবলি এবং নির্দেশিকা প্রণয়ন করা ও বাস্তবায়ন করা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষের প্রধানতম দায়িত্ব ও কার‌্যাবলির অন্তর্ভুক্ত।

সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং সঠিক পদ্ধতিতে বিকশিত করার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র-বীমার ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের বীমাশিল্পের ক্রমবিকাশে এবং ক্ষুদ্র-বীমা ব্যবস্থার অগ্রগতিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্¿ণ কর্তৃপক্ষ সঠিক ভূমিকা পালনে তৎপর হবে এটি সংশ্লিষ্টদের আশা। বীমা কর্তৃপক্ষ, সরকার, ক্ষুদ্র-বীমা পরিচালনাকারী সব বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ ভূমিকা পালনের দ্বারা সাধারণ মানুষের উপকারে আরও বলিষ্ঠ ও উপযুক্ত ভূমিকা পালনে তৎপর হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


-- ব্লগার দেলোয়ার হোসেন এর অন্যান্য পোস্টঃ --
আমার সম্পর্কে
  • সর্বশেষ ব্লগ
  • জনপ্রিয় ব্লগ
4 8 2 4
আজকের প্রিয় পাঠক
3 5 1 5 2 2 2 7
মোট পাঠক